শত অবহেলার পরও পাকিস্তানে টিকে থাকা সনাতনদের তীর্থস্থান কাটাসরাজ মন্দির
ভারতের ওড়িশা রাজ্যের রাজধানী ভুবনেশ্বর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত চৌষট্টি যোগিনী মন্দির, যা “মহামায়া মন্দির” নামেও পরিচিত। প্রাচীন ভারতের তান্ত্রিক সাধনা ও শক্তি উপাসনার এক অনন্য নিদর্শন হিসেবে এই মন্দির আজও ইতিহাস, ধর্ম এবং স্থাপত্যপ্রেমীদের কাছে বিশেষ আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। এখানে উপাসনা করা হয় যোগিনী নামে পরিচিত দেবী-সদৃশ শক্তিরূপগুলোর, যাদের হিন্দু তান্ত্রিক দর্শনে বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। এই মন্দিরের সবচেয়ে ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্য হলো এর ছাদবিহীন বা হাইপেথ্রাল স্থাপত্যশৈলী। খোলা আকাশের নিচে নির্মিত এই গোলাকার মন্দিরটি তান্ত্রিক উপাসনার দর্শনের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। তান্ত্রিক বিশ্বাস অনুযায়ী, প্রকৃতির পাঁচটি মৌলিক উপাদান—অগ্নি, জল, বায়ু, পৃথিবী ও আকাশ—এই সাধনার মূল ভিত্তি। সেই কারণেই এখানে পূজা-অর্চনা এমনভাবে সম্পন্ন হয় যাতে ভক্তরা সরাসরি প্রকৃতির সঙ্গে সংযুক্ত থাকতে পারেন। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, যোগিনীরা আকাশে বিচরণে সক্ষম, যা এই উন্মুক্ত স্থাপত্যের পেছনে একটি প্রতীকী ব্যাখ্যা প্রদান করে।
মন্দিরের ভেতরে স্থাপিত যোগিনী মূর্তিগুলো শক্তির বহুমাত্রিক প্রকাশকে ফুটিয়ে তোলে। হিন্দু দর্শনে আদিশক্তি সর্বোচ্চ সৃষ্টিশক্তি হিসেবে বিবেচিত, যিনি নিজ থেকেই সৃষ্টির সূচনা করেন এবং সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকে ধারণ করেন। সেই আদিশক্তির বিভিন্ন রূপই এখানে যোগিনীদের মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে। মূর্তিগুলিতে মানবজীবনের নানান আবেগ—ক্রোধ, আনন্দ, দুঃখ, উল্লাস ও কামনা—শিল্পরূপে প্রতিফলিত হয়েছে। অধিকাংশ মূর্তিতে দেবীদের পশু, অসুর বা মানুষের মাথার উপর দণ্ডায়মান অবস্থায় দেখা যায়, যা অশুভ শক্তির উপর শুভ শক্তির বিজয়ের প্রতীক। ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, খ্রিস্টীয় নবম শতাব্দীতে ভৌম বংশের রানি শান্তিকরদেবী (দ্বিতীয়) এই মন্দির নির্মাণ করেন। অনেক গবেষকের মতে, এটি ভারতের প্রাচীনতম চৌষট্টি যোগিনী মন্দিরগুলোর একটি। স্থানীয় কিংবদন্তি অনুসারে, দেবী দুর্গা এক অসুর বধের জন্য ৬৪টি রূপ ধারণ করেছিলেন। যুদ্ধ শেষে সেই যোগিনীরা নিজেদের স্মরণীয় করে রাখতে একটি মন্দির নির্মাণের অনুরোধ জানান, যার ফলস্বরূপ এই মন্দির প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে ইতিহাসের ধারায় এই মন্দির ধ্বংসযজ্ঞের শিকারও হয়েছে। জনশ্রুতি অনুযায়ী, ১৬শ শতকে মুসলিম সেনাপতি কালাপাহাড় মন্দিরে আক্রমণ চালিয়ে বহু মূর্তি ভেঙে ফেলেন। তিনি জগন্নাথ মন্দির এবং কোনার্ক সূর্য মন্দির ধ্বংসের সঙ্গেও জড়িত বলে পরিচিত।
স্থাপত্যের দিক থেকে মন্দিরটি ছোট হলেও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। প্রায় ২৫ ফুট ব্যাসের এই গোলাকার কাঠামোটি বেলেপাথরের ব্লক দিয়ে নির্মিত। এর অভ্যন্তরীণ দেয়ালের কুলুঙ্গিগুলোতে একসময় ৬৪টি যোগিনী মূর্তি স্থাপন করা ছিল, যার মধ্যে বর্তমানে প্রায় ৫৬টি টিকে আছে। মন্দিরের কেন্দ্রে স্থাপিত প্রধান দেবী কালী, যিনি একটি মানবমস্তকের উপর দাঁড়িয়ে আছেন—এটি অহংকার বা মনের উপর আত্মার বিজয়ের প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। পুরো মন্দিরটি একটি মণ্ডল পরিকল্পনার অনুসরণে নির্মিত, যেখানে সমকেন্দ্রিক বৃত্তের মাধ্যমে তান্ত্রিক দর্শনের গভীর প্রতীকী অর্থ প্রকাশ পেয়েছে।
All rights reserved ©